হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতি

বাংলাদেশের গ্রাম মানেই ছিল প্রাণ, মায়া, শান্তি আর আপন স্বাদ। মাটির গন্ধে ভরা ভোর, শীতকালে খেজুর রসের মিঠে স্বাদ, গ্রামের মাঠে ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি, বৈশাখে মেলার রং—এসবই যেন ছিল বাংলার প্রাণচিহ্ন।
কিন্তু সময় পাল্টেছে, সেইসঙ্গে পাল্টেছে মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার স্রোত এখন বইছে গ্রামেও। সেই স্রোতে ভেসে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা গ্রামীণ সংস্কৃতি। আজকের শিশুরা জানতেই পারছে না ‘দড়ি লাফ’, ‘গোল্লাছুট’ বা ‘কানামাছি’র নাম। তারা জানে মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম আর পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। আজকের উঠোনে আর বসে না পাড়াপড়শির আড্ডা; উঠোন এখন টাইলসে মোড়া, যার ভেতরে হাসিখুশির বদলে রয়েছে শীতলতা। যারা শৈশব গ্রামে কাটিয়েছে, তারা জানে ভোরের সেই সোনালি আলোয় উঠোন ধোয়ার দৃশ্য, ধান ভানার শব্দ, কিংবা ভোরে মোরগের ডাক কতটা প্রাণের ছিল। শীতকালে খেজুর রস আর হরেক রকমের পিঠা ছিল গ্রামের স্বাভাবিক জীবন। বিকেলের দিকে মাঠে ছেলেরা গোল্লাছুট, হাডুডু খেলত। মেয়েরা উঠোনে একসঙ্গে বসে গল্প করত, গান গাইত, লুকোচুরি খেলত।
কিন্তু এখন সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সকালের দৃশ্য, ভোরে আর উঠোনে জল ছিটানো হয় না, ঘরে থাকে ওয়াশিং মেশিন আর গ্যাসের চুলা। শিশুদের সকালে স্কুল, বিকেলে কোচিং। খেলাধুলার জায়গা নেই, মাঠ জায়গা করে দিয়েছে ইট, বালু আর কংক্রিটকে। একসময় গ্রামে গ্রামে বাউল, ভাটিয়ালি, পালাগান কিংবা যাত্রাপালা ছিল আনন্দের উৎস। শীতকালে কিংবা বৈশাখে গ্রামীণ মেলাগুলো হতো সংস্কৃতির বড় উৎসব। গ্রামীণ সমাজে বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই ছিল পল্লিগীতি, ঢোল, শানাই আর নাচগান। এখনকার বিয়েতে বাজে ডিজে, মাইকের তীব্র আওয়াজ, আর ফ্যাশনের আধিক্য। লোকগান হারিয়ে গিয়ে জায়গা নিয়েছে হিন্দি কিংবা পশ্চিমা গানের কোলাহল। ‘বাউল’ শব্দটি এখন বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। গ্রামীণ কবিয়ালদের কণ্ঠ আজ শোনা যায় না।
অথচ এসব শিল্পই ছিল বাংলার প্রাণস্পন্দন। প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে; কিন্তু একই সঙ্গে কেড়ে নিচ্ছে আমাদের শিকড়কে। আগে সন্ধ্যা নামলেই গ্রামে শুরু হতো আড্ডা, গল্পগুজব, ধাঁধা কিংবা খেলার আসর।
আজ সেই আড্ডার জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোন। প্রতিটি বাড়িতে এখন টেলিভিশন, ইন্টারনেট। শিশু আর কিশোররা মাঠে খেলতে যায় না; তারা ব্যস্ত ভিডিও গেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। প্রযুক্তি যেমন আমাদের কাছে এনেছে পৃথিবীকে, তেমনি কেড়ে নিয়েছে প্রতিবেশীকে। আগে প্রতিবেশী ছিল পরিবারের অংশ, এখন অনেকেই পাশের বাড়ির মানুষকে চেনে না। গ্রামের সংস্কৃতি মানেই ছিল এক ধরনের সামাজিক বন্ধন। আনন্দ-দুঃখে সবাই সবার পাশে থাকত। ধানের গোলা ভরলে পাড়াপড়শি ডাকত, গৃহস্থ বাড়িতে নতুন ফসল এলে সবাইকে খাওয়াত। কোনো বাড়িতে বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান হলে গ্রামবাসী একসঙ্গে কাজ করত। এখন সেই একতা হারিয়ে যাচ্ছে। অনুষ্ঠান মানেই এখন কেটারিং সার্ভিস, বাইরের লোকের রান্না, মাইকের শব্দ। আর গ্রামবাসী তো কেবল নিমন্ত্রিত অতিথি, শ্রম ভাগাভাগির অংশ আর নয়।
বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি কৃষিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল। ধান কাটা, পাট কাটা, আমন ধানের মৌসুমে গ্রামের মাঠ মুখর থাকত শ্রমিকের কণ্ঠে। কৃষকরা মাঠে কাজ করত দলবদ্ধ হয়ে, আর সেই কাজের ভেতরেও ছিল গান, হাসি, আনন্দ। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন কৃষিও যান্ত্রিক হয়ে গেছে। হারভেস্টার, ট্রাক্টর, থ্রেশার মেশিন সব কাজ করে ফেলে। যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে দ্রুত কাজ শেষ হলেও হারিয়ে গেছে সেই মিলনমেলা, হাসি আর শ্রমের বন্ধন। গ্রামীণ সমাজে আজ শহরের প্রভাব প্রবল। তরুণ প্রজন্ম শহরে চলে যাচ্ছে চাকরির জন্য, পড়াশোনার জন্য। যারা থাকে, তারাও শহুরে জীবনযাত্রার অনুসরণ করছে। ঘরে আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টেলিভিশন, মোটরবাইক সবকিছুই শহরের জীবনধারা নিয়ে এসেছে গ্রামে। এর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সহজ-সরল জীবনযাত্রা। গোল্লাছুট, কানামাছি, বউচি, লাঠিখেলা, দড়ি লাফ, হাডুডু, ডাংগুলি এসব খেলা একসময় ছিল শিশু-কিশোরদের নিত্যদিনের আনন্দ। আজ সেগুলো বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। মাঠে এখন গরু রাখা হয় না, খেলার জায়গা নেই। শিশুরা খেলে মোবাইল গেম, দেখে কার্টুন নেটওয়ার্ক। পহেলা বৈশাখ একসময় ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় উৎসব। গরুর গাড়িতে চড়ে মেলায় যাওয়া, বাঁশির সুরে ভেসে যাওয়া, নাগরদোলা কিংবা হরেক রকমের মিষ্টির দোকান সবকিছুই ছিল বৈশাখের প্রাণ। এখন সেই মেলা আগের মতো নেই। অনেক জায়গায় মেলা বন্ধ হয়ে গেছে নিরাপত্তার কারণে, আবার কোথাও কোথাও মেলাও শহুরে ছোঁয়ায় হারিয়েছে গ্রামীণ স্বাদ। যারা গ্রামে জন্ম নিয়ে বড় হয়েছে, তারা আজও যখন ফিরে তাকায় তখন এক ধরনের বেদনা জাগে। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া সেই সংস্কৃতির সঙ্গে। দাদার হাতে তালপাতার পাখা, মায়ের হাতে পিঠা বানানো, বা শীতে কুয়াশা ভেদ করে স্কুলে যাওয়া এসব আজও বুক কাঁপায়। অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম, তারা এসব জানেই না। তারা জানে কেবল ইন্টারনেট, মোবাইল, কোচিং আর প্রতিযোগিতা।
গ্রামীণ সংস্কৃতি মানে শুধু কিছু খেলা বা গান নয়; এটি আমাদের শিকড়, আমাদের আত্মপরিচয়। আমরা যদি একে বাঁচাতে না পারি, তবে পরবর্তী প্রজন্ম জানবে না তাদের পূর্বপুরুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল। স্কুল-কলেজে লোকগান, গ্রামীণ খেলা ও সংস্কৃতি শেখানো উচিত। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মেলা, পালাগান, বাউল ফেস্টিভাল আয়োজন করা যেতে পারে। গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে গ্রামীণ সংস্কৃতির অনুষ্ঠান প্রচারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পরিবার থেকে শুরু করা। বাবা-মা যদি সন্তানকে গ্রামীণ খেলাধুলায় উৎসাহিত করেন, গ্রামীণ উৎসবে নিয়ে যান, তবে হয়তো আগামী প্রজন্ম আবার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। গ্রামের গল্প কেবল গল্প নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের আত্মা। আধুনিকতার ঢেউ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু সে ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে আমাদের অতীত, আমাদের শিকড়, আমাদের সংস্কৃতি।

