রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আত্মরক্ষায় দক্ষ হোক প্রতিটি মেয়ে

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৪০ বার

https://epaper.alokitobangladesh.com/?date=2026-07-13&page=6&news=06_103

আত্মরক্ষায় দক্ষ হোক প্রতিটি মেয়ে

সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি অপরাধের ধরনও হয়েছে আরও জটিল এবং বহুমাত্রিক। একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো সেখানে নারী কতটা নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঘর থেকে বের হওয়ার মুহূর্ত থেকে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন কিংবা অনলাইন, সব জায়গাতেই প্রায়শই অনেক নারী ও কন্যাশিশুকে নানাভাবে নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে যৌন হয়রানি, স্টকিং, পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, অ্যাসিড হামলা কিংবা সাইবার ব্ল‍্যাকমেইলিংয়ের মতো খবর আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে তোলে। আইন রয়েছে, সচেতনতামূলক কর্মসূচিও রয়েছে; তবুও সহিংসতার ঘটনা পুরোপুরি থামছে না। এমন বাস্তবতায় একটি বিষয় ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেটি হলো প্রতিটি মেয়ের আত্মরক্ষার দক্ষতা অর্জন। তবে আত্মরক্ষার বিষয়টি নিয়ে সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, আত্মরক্ষা মানেই মার্শাল আর্ট জানা বা শারীরিক শক্তিতে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা। বাস্তবে আত্মরক্ষা তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত একটি জীবনদক্ষতা। বিপজ্জনক পরিস্থিতি আগে থেকেই শনাক্ত করা, ঝুঁকি এড়িয়ে চলা, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিবাদ করা, দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া, আশপাশের মানুষের সহায়তা চাওয়া এবং প্রয়োজন হলে নিজের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা, এসবই আত্মরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতিসংঘের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে প্রায় একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রেই এই সহিংসতা ঘটে পরিচিত মানুষের হাতেই। একই সঙ্গে অসংখ্য নারী সামাজিক লজ্জা, ভয় কিংবা বিচারহীনতার আশঙ্কায় অভিযোগই করেন না। বাংলাদেশেও নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মেয়েরা আজ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রকৌশলী, গবেষক, বিচারক, সেনা কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, ক্রীড়াবিদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও সফলতার পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্নটি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক পরিবার নিরাপত্তার শঙ্কায় মেয়েদের একা বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করেন। অথচ সমাধান মেয়েদের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি মেয়ে নিরাপদ থাকবে এবং নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি সংকটময় মুহূর্তে সহজে ভেঙে না পড়ে দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারেন এবং সঠিক ও নিরাপদ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেন। গবেষক চার্লিন ওয়াই, সেন ও তাঁর সহকর্মীদের পরিচালিত ২০১৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মরক্ষা ও আত্মবিশ্বাসভিত্তিক প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণ নারীদের যৌন সহিংসতার ঝুঁকি কমাতে, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে সমাজবিজ্ঞানী জসলিন এ. হল্যান্ডারের ২০১৪ সালের গবেষণায়, যেখানে আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ নারীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও ভয় কমাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রশিক্ষণ স্কুলপর্যায়ে চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। যেমন: কেনিয়া, জাপান, ভারত, কানাডা। তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। আত্মরক্ষার দায়িত্ব শুধু মেয়েদের নয়। নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ লুকিয়ে আছে বৈষম্যমূলক সামাজিক মানসিকতা এবং নারীর প্রতি অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাই আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ যতটা প্রয়োজন, ততটাই প্রয়োজন ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই সম্মান, সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মতির শিক্ষা দেওয়া। একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হয়, যখন ভুক্তভোগীকে শুধু সতর্ক করা হয় না; বরং অপরাধীকেও অপরাধ থেকে বিরত রাখার মতো মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলা হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মরক্ষা শিক্ষাকে সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মশালা, নিরাপত্তা শিক্ষা এবং মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শুধু মেয়েদের জন্য নয়, ছেলে শিক্ষার্থীদেরও পারস্পরিক সম্মান এবং নিরাপদ সামাজিক আচরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়, বরং দায়িত্বশীল ও নিরাপদ নাগরিক গড়ে তোলার কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারবে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তাও আত্মরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি, অবস্থান বা তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে সচেতনতা, ভুয়া পরিচয় শনাক্ত করার সক্ষমতা, অনলাইন হয়রানি সম্পর্কে ধারণা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!