বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বর্জন: আত্মপরিচয়হীন ও চিন্তাবিমুখ প্রজন্ম গড়ার আত্মঘাতী পদক্ষেপ

Author

মোছাঃ ইসমা খাতুন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ৯ জুন ২০২৬ পাঠ: ১৫০ বার

  1. দেশের উচ্চ শিক্ষাকে কর্মমুখী করতে শিক্ষা খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন সরকার। এরই প্রেক্ষিতে পরবর্তী প্রজন্মকে আধুনিক, সৃজনশীল এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্দেশ্য নতুন পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি ও অন্যান্য প্রযুক্তি নির্ভর আউটসোর্সিং দক্ষতা ভিত্তিক বিষয়। মূলত শিক্ষার সাথে কর্মসংস্থানের সংযোগ বাড়ানো এবং আধুনিক বিশ্বে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য উদ্যোগটি আসলেই প্রশংসনীয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো এর পাশাপাশি বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ে অনার্স কোর্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বাংলা, ইতিহাস এবং দর্শন আমাদের সংস্কৃতির মৌল প্রত্যয়। এই বিষয়গুলোই আমাদেরকে বাঙালী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। একটি গাছের ডালপালা যতই পুষ্ট হোক, তার শেকর কেটে দিলে এই গাছের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। বাংলা, ইতিহাস, দর্শন বাঙালীর জন্য সেই শিকরস্বরুপ। বাঙালি বাংলা পড়বে না, ইতিহাস জানবে না এ বিষয়টি কতটুকু যৌক্তিক? যে দেশে শুধুমাত্র ভাষার জন্য তরুণ যুবকেরা অকাতরে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে প্রাণ দিয়ে গৌরবউজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করেছে সেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বলে মনে করছি। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আত্মপরিচহীনভাবে কখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়া সম্ভব? বাংলা বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের অস্তিত্বের কথা, আমাদের উত্থান-পতন, আমাদের আত্মপরিচয়, নৈতিকতা মূল্যবোধকে শেখায়। ইতিহাসের মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের গৌঁরবগাথা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী জীবনের পথ পরিচালনা করে থাকি। মানুষকে অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে যুক্তিবিচারের মাধ্যমে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালনা করে দর্শন। এই বিষয়গুলো আমাদের মৌলিক ভিত্তি। এগুলো যদি শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া হয় তাহলে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রোবটের মত কাজ করতে পারবে। কিন্তু তারা নিজেকে, নিজের সংস্কৃতিকে, নিজের দেশকে কি চিনতে পারবে? একটি এআই দ্বারা নির্ভুল হিসাব করা যায় কিন্তু নৈতিকভাবে সেটা যৌক্তিক কিনা তা বিচার করা যায় না। একটি জাতির মেধা, মনন, নৈতিকতা, মূল্যবোধ গড়ে ওঠে তার সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে।

    বর্তমান আধুনিক বিশ্বে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এবং কারিগরি শিক্ষা জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে সে বিষয়টি যৌক্তিক। কারণ বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাবজেক্টিভ চাকুরী না থাকায় দিন দিন শিক্ষিত বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েই চলছে। এ পরিস্থিতির অবসানের লক্ষ্যে নতুন নতুন জব রিলেটেড সাবজেক্ট প্রণয়ন করা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার জন্য এই সাবজেক্টগুলো বাদ দিতে হবে কেন? তাছাড়াও নতুন নতুন সাবজেক্ট প্রণয়ন করলে চলবে না। তার আগে চাই ওই ওই সেক্টরভিত্তিক কর্মসংস্থান। সাবজেক্টিভ কর্মসংস্থান থাকলে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের পছন্দমত সাবজেক্ট নির্ধারণ করতে পারবেন। তাদের যদি মনে হয় বাংলা, ইতিহাস, দর্শন সাবজেক্ট পড়ার মতো নয়, তাহলে তারা নিজেরাই সেই সাবজেক্টগুলো পড়বেন না। কিন্তু এই সাবজেক্টগুলো বিলীন করে আমরা আমাদের আত্মপরিচয় কে সংকুচিত করতে পারি না। আমার মনে হয়, আমরা যদি আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ঠিক মতো না জানতে পারি, তাহলে খুব সহজেই আমরা অপসংস্কৃতি ও উগ্রবাদে হারিয়ে যাবো। বর্তমান ডিজিটাল আসক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে তাকালেও দেখা যায়, এসব প্রযুক্তিকে আসলে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছে না বরং এরাই মানুষকে নিয়ন্ত্রিত করছে। যা এক সময় মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরুপ হয়ে দাঁড়াবে। যে জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা যত উন্নত সেই জাতি ততো বেশি সমৃদ্ধশীল হয়। তাই শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সার্বিক বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ছাড়া কখনোই একজন মানুষ আত্মমর্যাদাশীল, বিবেকবান ও মুক্তচিন্তার মানুষ হতে পারে না। কর্মমুখী শিক্ষার নামে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এগুলো বাদ দেওয়া মানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একসাইড পঙ্গু করে দেওয়া। যেখানে অক্সফোর্ড-হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই সাবজেক্ট গুলোকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় সেখানে আমাদের দেশে এ গুলো বাদ দেওয়া আক্কেল সেলামি ছাড়া কিছুই নয়। আমরাও নতুন,স্মার্ট, সুন্দর ও একটি আদর্শিক শিক্ষা কারিকুলাম চাই। তবে সেটা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে নয়। তাই এই সাবজেক্টগুলোর মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ, মানবিক ও দূরদর্শী শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!