বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / সাহিত্য / নিবন্ধ

ইবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় নজরুল

Author

মোছাঃ ইসমা খাতুন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ পাঠ: ৬৯ বার

‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তু্র্য’ বিদ্রোহী কবিতার এই একটিমাত্র লাইন দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সমগ্র জীবন দর্শনকে এমন ভাবে প্রকাশ করেছেন যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। একই সাথে তিনি ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও ধ্বংসের প্রতীক। অন্যদিকে প্রেম, সৌন্দর্য ও কোমলতার পীড়িত মানুষের ভালবাসার আকুন্ঠে বন্দি এক মহামানব। মূলত প্রেম থেকেই তার বিদ্রোহী সত্তার জাগরণ ঘটে। কারণ তিনি পীড়িত দেশ ও দেশের মানুষের দুঃখ, কষ্ট, হতাশা সহ্য করতে পারতেন না। তাই তাদের ভালোবাসা থেকেই, তাদের মুক্তির জন্যই তার এমন বিদ্রোহী সত্তার জন্ম ঘটেছে। তার জীবন দর্শনের অন্যতম মূল সুর ছিল অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতা। তিনি বলেছেন, “বিশ্বের যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম মধ্যে গলদ দেখিয়ে তিনি সমাজের অসমতা দূর করার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর দর্শন যুগে যুগে সকল বৈষম্য, অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে থাকবে। একবিংশ শতকে এসেও নজরুলের এই দর্শন যেন একদম জীবন্ত এবং আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীর অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত প্রত্যেক সময়ের জন্যই তাঁর এই জীবন দর্শনটি জীবন্ত হয়ে থাকবে। তাঁর দূরদর্শী সত্তাকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন মোছাঃ ইসমা খাতুন।

সংগ্রামে নজরুল:
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী চেতনার কবি, বাংলাদেশের গণমানুষের কবি। তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই লড়াই-সংগ্রাম করেছেন অনিয়ম, অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। এ লড়াই করতে গিয়ে তার সাহিত্য জীবনের অধিকাংশ সময়ে রাজরোষোর শিকার হন। ১৯২২-১৯৩১ সাল পর্যন্ত নয় বছরে তার পাঁচটি বই নিষিদ্ধ হয়। কারাদন্ডে দন্ডিত হয়েছিলেন দুইবার। ১৯২৩ সালে প্রথমবার এক বছরের জন্য কারাগারে যেতে হয় “আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতা লেখার জন্য। ১৯৩০ সালে দ্বিতীয়বার “প্রলয় শিখা” কাব্যগ্রন্থের জন্য আরেকবার কারাগারে যেতে হয়। একের পর এক বাজেয়াপ্ত ও কারাদণ্ডের আদেশে তিনি ভারতে পরিচিত হয়ে ওঠেন আপসহীন ও প্রতিবাদী কবিরুপে স্বাধীনতাকামীদের কাছে তিনি পরিণত হন মুক্তির অগ্রদূত হিসাবে।  এ জন্য তাকে বলা হয় ‘বিদ্রোহী কবি’। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং নাটকে অনিয়ম, অনাচার, নির্যাতন,দাসত্ব, সাম্প্রদায়িকতা এবং ঔপনিবেশিকবাদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ছিল। যেখানেই যা অনিয়ম দেখেছেন সেখানেই তার বিরুদ্ধে তার কলম চলছিল তীব্র বেগে। কখনোই কোনো অন্যায়কে তিনি প্রশ্রয় দেননি।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, সমাজের বিভিন্ন কুসংস্কার, অনিয়ম, নারীর অধিকার ও সমান মর্যাদা আদায়ে, ধনী-গরীবের বৈষম্য দূরীকরণ, অত্যাচারী শোষকদের বিরুদ্ধে, ধর্মের কুসংস্কার ইত্যাদি সবকিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মুক্তির আহ্বান এবং সাম্য ও মানবতার বার্তা সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায় তার লেখায়। শতবাধা আসলেও থামেনি তার কলম, হননি পিছপা। জেলে বন্দি অবস্থায় লিখেছিলেন “রাজবন্দীর জবানবন্দি” প্রবন্ধ। সমাজের সমস্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি শক্তি সংগ্রহ করেছিলেন ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ,ধর্মগ্রন্থ ইত্যাদি থেকে। শান্তিতে-সংগ্রামে, প্রেম-বিরহে, আনন্দ-বেদনায়, অবচেতন-জাগরণে সর্বদা নজরুল প্রাতঃস্মরণীয়। তাই যেকোনো অন্যায়কে রুখে দিতে তার রচিত কবিতা, গান, কন্ঠস্বর আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি এবং আমাদের উজ্জীবন ও প্রাণের সুর।
মোজাহিদ হোসেন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

অগ্নিবীণার ঝংকার ও চিরতরুণ নজরুল:
বাঙালি মানসের আবেগ, দ্রোহ ও প্রেমের এক অবিচ্ছেদ্য নাম কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যের এই জাতীয় কবি কেবল একটি নাম নন, বাঙালির চেতনা ও অনুভূতির এক জীবন্ত আবেগ। প্রেম থেকে শুরু করে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্র—তাঁর সৃষ্টির বিশালতা প্রতিটি বাঙালিকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। “বল বীর- বল উন্নত মম শির!” অর্থাৎ তিনি শিখিয়েছেন যেকোনো পরিস্থিতিতে কিভাবে আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। প্রথম যখন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পড়ি মনে হয়েছিল প্রতিটি শব্দ যেন আমার নিজের ভেতরের না বলা কথা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শির উঁচু করে দাঁড়ানোর যে সাহস তিনি যুগিয়েছেন, তা এক অদম্য শক্তির উৎস। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি যেন আজকেও দাঁড়িয়ে আছেন সব বৈষম্য আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে। আমার ক্যাম্পাসের দু’টো অনুষ্ঠানে সৌভাগ্যক্রমে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চরিত্রে নিজেকে মঞ্চস্থ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। নজরুল আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি বাঁকে এক পরম আত্মীয়ের মতো জড়িয়ে আছেন। বাঙালির সুখে-দুঃখে, উৎসবে ও সংগ্রামে নজরুল সবসময় আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা এবং পথ চলার চিরন্তন সঙ্গী।
সাইফুল ইসলাম রোহান
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

নজরুল বিদ্রোহ, প্রেম ও মানবতার চিরজাগ্রত দীপশিখা:
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য উজ্জ্বল নাম। বাংলা ইতিহাসে মধ্যে দিয়ে নজরুল তাঁর আদর্শ, সাহিত্যচেতনা ও মানবিক মূল্যবোধকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেছেন বহুমুখী দর্শনকে । কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি। তাঁর লেখায় যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি ফুটে উঠেছে প্রেম, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী এবং তিনি ছিলেন ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মানবতার কবি। “বিদ্রোহী”, “সাম্যবাদী”, “অগ্নিবীণা” প্রভৃতি রচনায় তিনি মানুষের অধিকার ও মুক্তির কথা বলেছেন। তাঁর গান, কবিতা ও সাহিত্যকর্ম আজও মানুষকে সাহস, শক্তি ও অনুপ্রেরণা দেয়। তাঁকে স্মরণীয় রাখতে আজও আমাদের দেশে নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজন করে থাকে। কবিতা আবৃত্তি, নজরুল-সংগীত, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কবির জীবন ও কর্ম তুলে ধরা হয়। এতে আমাদের মতো নতুন প্রজন্ম তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে নতুনভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। তাঁর সৃষ্টি শুধু সাহিত্য নয়, মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে সাহস, ভালোবাসা এবং সত্যের পথে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা।
ফাইজা আক্তার আলো,
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

নজরুল নতুন সৃষ্টির আবাহন:
নজরুল নামটি শুনলেই মনে হয় যেন আবার নতুন করে সাহস সঞ্চার করার অনুপ্রেরণা যোগানোর শক্তি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর কবিতা আর গান শুনলেই বুকের ভেতর অন্যরকম একটা শক্তি কাজ করে। তিনি শুধু কবিতা লিখেননি, মানুষের মনের কথাও বলেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, সেটাও তিনি শিখিয়েছেন। তাঁর লেখায় যেমন বিদ্রোহ আছে, তেমনি আছে ভালোবাসা আর মানবতার কথাও। এ কারণেই এত বছর পরেও মানুষ তাঁকে এত ভালোবাসে। নজরুলের গান শুনলে মনটা কেমন শান্ত হয়ে যায়। আবার তাঁর কবিতা পড়লে ভেতরে জেগে ওঠে সাহস। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে তিনি অশুভকে ধ্বংস করে নতুনকে সৃষ্টির আহ্বান করেছেন তার বিভিন্ন কবিতায়। তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের বাংলা সাহিত্যকে আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ মাধ্যমে নতুন দিগন্তের পথ উন্মোচন করেছে। নজরুল বাংলা সাহিত্যের এক অমর কিংবদন্তি লেখক।
মরিয়ম ফেরদৌস,
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!