শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

প্লাস্টিকের দখলে আগামীর ভবিষ্যৎ

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৬ বার

প্লাস্টিকের দখলে আগামীর ভবিষ্যৎ

দৈনন্দিন সকালের খাবার থেকে শুরু করে বাজারের ব্যাগ, পানির বোতল, খাবারের মোড়ক, ওষুধের প্যাকেট।আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরে প্লাস্টিকের উপস্থিতি বিদ্যমান। হালকা, সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় এই উপাদান আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে প্লাস্টিক আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেটিই আজ পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। সুবিধার জন্য হাতে তুলে নেওয়া একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ হয়তো কয়েক মিনিট ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তার পরিবেশগত ক্ষতি টিকে থাকতে পারে বহু বছর। আমরা কি সুবিধার নামে ধীরে ধীরে আমাদের ভবিষ্যৎকেই প্লাস্টিকের দখলে তুলে দিচ্ছি? বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার গত দুই দশকে দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, দেশের শহরাঞ্চলে মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালের প্রায় ৩ কেজি থেকে ২০২০ সালে বেড়ে ৯ কেজিতে পৌঁছেছে। রাজধানী ঢাকায় এই পরিমাণ আরও বেশি। মাথাপিছু বছরে প্রায় ২২ দশমিক ৫ কেজি। দ্রুত নগরায়ণ, ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের সহজলভ্যতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
সমস্যা শুধু প্লাস্টিকের ব্যবহার নয়; সবচেয়ে বড় সমস্যা ব্যবহারের পর তার গন্তব্য। একটি প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন বা খাবারের মোড়ক ব্যবহারের পর আমরা যেখানে-সেখানে ফেলে দিই। সেগুলো ড্রেন, খাল, নদী কিংবা খোলা জায়গায় গিয়ে জমা হয়। বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাবে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, কিন্তু এর মাত্র ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ পুনঃচক্রায়নের আওতায় আসে। বাকি অংশের বড় একটি অংশ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়। ড্রেন ও নর্দমা প্লাস্টিক বর্জ্যে আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়; বর্ষাকালে যার ভোগান্তি বহন করতে হয় নগরবাসীকে। প্লাস্টিকের ক্ষতি শুধু চোখে দেখা আবর্জনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের সঙ্গে বড় প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এই ক্ষুদ্র কণা মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশের আশঙ্কা তৈরি করে। নদী ও জলাশয়ে প্লাস্টিক জমলে জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী প্লাস্টিককে খাবার ভেবে গ্রহণ করতে পারে কিংবা প্লাস্টিকের মধ্যে আটকে মারা যেতে পারে। এভাবে মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্যের নির্মম স্বীকার হচ্ছে প্রকৃতির অসংখ্য প্রাণ।
বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই সংকট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নদী, খাল ও জলাভূমি শুধু প্রকৃতির অংশ নয়; মানুষের জীবন, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। যখন প্লাস্টিক বর্জ্য এসব জলপথে প্রবেশ করে, তখন দূষণ এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পানির স্রোত তা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত স্থলভাগে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকও বৃহত্তর জলজ পরিবেশ ও সমুদ্র দূষণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এ সমস্যার অন্যতম বড় উৎস। দোকান থেকে একটি ছোট পণ্য কিনলেও প্লাস্টিকের ব্যাগ, খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিকের চামচ বা পাত্র, পানীয়ের সঙ্গে প্লাস্টিকের স্ট্র এগুলো ব্যবহারের সময় হয়তো কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট। কিন্তু ব্যবহারের পর এগুলো সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়ন করা কঠিন। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১ জুন ২০২৫ থেকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক স্ট্রর উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ, তবে একটি বা দুটি পণ্য নিয়ন্ত্রণ করলেই পুরো সংকটের সমাধান হবে না। সরকারও এখন প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনকারীর দায়িত্ব বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে। ২০২৬ সালে প্রণীত ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব বা ইপিআর নির্দেশিকা’ অনুযায়ী, প্লাস্টিক পণ্যের প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের ব্যবহারের পর সৃষ্ট বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্দেশিকায় প্রথম দুই বছরে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যূনতম ১৫ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুনঃচক্রায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো, প্লাস্টিক উৎপাদন করে বাজারে ছেড়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; ব্যবহারের পর সেই বর্জ্যেরও দায় নিতে হবে। তবে আইন ও নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়ন। আমরা অনেক সময় প্লাস্টিকের ক্ষতি সম্পর্কে জানি, তবু অভ্যাস বদলাই না। বাজারে যাওয়ার সময় কাপড় বা পাটের ব্যাগ নেওয়া কঠিন নয়, কিন্তু আমরা সহজ পথ হিসেবে প্লাস্টিকের ব্যাগই নিই। প্রয়োজন না থাকলেও বোতলজাত পানি কিনি, একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহার করি। ফলে সমস্যাটিকে শুধু সরকার বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। নাগরিকের আচরণ পরিবর্তনও সমান জরুরি।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল বা ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহার এবং পুনঃচক্রায়ন। প্রথমেই অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে হবে। যে পণ্য বারবার ব্যবহার করা সম্ভব, সেটি একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাজারে গেলে নিজের ব্যাগ নেওয়া, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক প্যাকেজিং এড়িয়ে চলা। এসব ছোট সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পাশাপাশি বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। কারণ সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে ফেলে দিলে পুনঃচক্রায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য পৃথকীকরণের ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষার্থীদের পরিবেশবান্ধব আচরণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। শুধু একদিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা সচেতনতামূলক সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; পরিবেশ রক্ষাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের টেকসই প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় বাংলাদেশে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ প্লাস্টিক পুনঃচক্রায়ন, ২০২৬ সালের মধ্যে নির্দিষ্ট একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ৯০ শতাংশ কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০২০/২১ সালের ভিত্তিবছরের তুলনায় প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। লক্ষ্য নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি পরিমাপ করা এবং বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আধুনিক জীবনে সব ধরনের প্লাস্টিক একদিনে বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু যেসব প্লাস্টিকের বিকল্প রয়েছে, বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে, সেখানে পরিবর্তন আনতেই হবে। সরকারকে কার্যকর নীতি ও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, উৎপাদনকারীকে বর্জ্যের দায় নিতে হবে, স্থানীয় সরকারকে সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং নাগরিককে বদলাতে হবে নিজের অভ্যাস। আজ যে প্লাস্টিক আমরা রাস্তায়, ড্রেনে বা নদীতে ফেলে দিচ্ছি, সেটি আসলে শুধু একটি বর্জ্য নয়; এটি আগামী দিনের জন্য রেখে যাওয়া একটি সমস্যা। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন প্লাস্টিকের পাহাড়, দূষিত নদী ও বিষাক্ত পরিবেশের উত্তরাধিকারী না হয়, সে দায়িত্ব আজই নিতে হবে। সুবিধার জন্য ব্যবহৃত কয়েক মিনিটের প্লাস্টিক যেন শত বছরের পরিবেশগত বোঝায় পরিণত না হয়।সেটিই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার। নইলে একদিন হয়তো সত্যিই বলতে হবে, আমরা ভবিষ্যৎ গড়তে পারিনি; ভবিষ্যৎকে প্লাস্টিকের দখলে ছেড়ে দিয়েছি।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।