শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

শ্রেণিকক্ষে ফিরুক কৌতূহল

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৪ বার

শ্রেণিকক্ষে ফিরুক কৌতূহল

একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের এক পর্যায়ে কৌতূহলের জাগরণ ঘটে। পৃথিবীতে থাকা অনেক কিছু নিয়েই সে ভাবে। আকাশ নীল কেন, গাছের পাতা সবুজ কেন, বৃষ্টি হয় কীভাবে, চাঁদ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলে কেন? এমন অসংখ্য প্রশ্নের মধ্য দিয়েই একটি শিশুর পৃথিবীকে জানার যাত্রা শুরু হয়। প্রথম প্রশ্নটি সাধারণত খুব ছোট ‘কেন?’ কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্ন করার প্রবণতা অনেক সময় কমে যায়। পরীক্ষার প্রস্তুতি, নম্বরের প্রতিযোগিতা, মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা ও ভুল করার ভয় ধীরে ধীরে শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহলকে সংকুচিত করে। অথচ শিক্ষা যদি কেবল প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার নাম হয়, তাহলে সেখানে শেখার আনন্দ কোথায়? বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ২০২৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী শিশুদের প্রায় ৯৭ শতাংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি ছিল এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ২০১০ সালের ৪০ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু বিদ্যালয়ে পৌঁছানো আর কার্যকরভাবে শেখা এক বিষয় নয়। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৫১ শতাংশ শিশু একটি সাধারণ অনুচ্ছেদ পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না। অর্থাৎ শিক্ষার দরজা আরও বেশি শিশুর জন্য খুললেও শ্রেণিকক্ষে শেখার মান নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এখানেই এসে পড়ে কৌতূহলের প্রশ্ন। একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন সে শুধু উত্তর জানতে চায় না; সে বিষয়টি বুঝতে চায়। ‘গাছ খাবার তৈরি করে কীভাবে?’ এই প্রশ্ন থেকে একজন শিক্ষার্থী সালোকসংশ্লেষণ বুঝতে পারে। ‘লোহার জাহাজ পানিতে ডুবে না কেন?’ প্রশ্নটির উওর তাকে ভাসমানতার ধারণার দিকে নিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ প্রশ্নই জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক সময় প্রশ্নের চেয়ে উত্তর বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় কী আসবে, কত নম্বরের প্রশ্ন, কোন সংজ্ঞা মুখস্থ করতে হবে, কোন টাইপ রিপিট করে। এসব চিন্তা শিক্ষার্থীর শেখার আনন্দকে ছাপিয়ে যায়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে শিশু ও তরুণদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে যে মুখস্থনির্ভরতা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনে বাধা দেয়। একই প্রতিবেদনে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি, প্রযুক্তির অসম সুযোগ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সমস্যাটি অবশ্য শুধু শিক্ষার্থীর নয়। শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষকতার পদ্ধতি, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং পরিবারের প্রত্যাশা সবকিছু মিলেই একজন শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। কোনো শিশু যদি প্রশ্ন করার পর বারবার শুনতে পায়, ‘এত প্রশ্ন করো কেন?’ অথবা ভুল উত্তর দিলে সহপাঠীদের সামনে বিব্রত হতে হয়, তাহলে একসময় সে প্রশ্ন করাই বন্ধ করে দিতে পারে। সে বুঝে সঠিক উত্তর না জানলে চুপ থাকাই নিরাপদ। অথচ ভুল থেকে শেখার সুযোগই তো শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন ভালো শিক্ষক শুধু তথ্য দেন না; তিনি শিক্ষার্থীর মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করেন। তিনি হয়তো ক্লাস শুরু করতে পারেন একটি প্রশ্ন দিয়ে। এরপর বইয়ের তথ্য তার কাছে আর নিছক মুখস্থ বিষয় থাকে না; বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এও শিক্ষাকে যুগোপযোগী, বিজ্ঞানমনস্ক ও সৃজনশীল করে তোলার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নীতিতে যা লেখা থাকে, তার বাস্তব প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি দেখা যায় শ্রেণিকক্ষে। ২০২৬ সালের শিক্ষা খাত বিশ্লেষণেও সরকার, ইউনিসেফ ও অংশীদাররা শিক্ষক উন্নয়ন, শিখনফল, অন্তর্ভুক্তি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও শিক্ষার মানোন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইউনিসেফের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু শক্তিশালী নীতির ওপর নির্ভর করে না; শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষা কেন্দ্রে সেই নীতি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৌতূহল ফিরিয়ে আনতে তাই শুধু নতুন বই বা নতুন কারিকুলাম যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীর শেখার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। শ্রেণিকক্ষে আলোচনা বাড়াতে হবে, দলগত কাজের সুযোগ দিতে হবে, বাস্তব উদাহরণ ব্যবহার করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের নিজের ভাষায় উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষায় পরীক্ষাগার, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও হাতে-কলমে কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। ইতিহাসে শুধু সাল-তারিখ মুখস্থ না করিয়ে ঘটনার কারণ ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সাহিত্যকে শুধু প্রশ্নের উত্তর লেখার বিষয় না বানিয়ে অনুভব ও বিশ্লেষণের জায়গা করে দিতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় এ পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই সময়েই শিশুর শেখার ভিত্তি তৈরি হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিজস্ব পরিকল্পনাতেও শ্রেণিভিত্তিক ও বিষয়ভিত্তিক প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বা পাঠ্যবই বিতরণ নয়, একজন শিক্ষার্থী আসলে কী শিখছে সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। এ ক্ষেত্রে মূল্যায়নব্যবস্থারও পরিবর্তন দরকার। একটি পরীক্ষায় শিক্ষার্থী কতটি সংজ্ঞা বা সূত্র মনে রাখতে পেরেছে, সেটি দিয়ে তার প্রকৃত জ্ঞান সবসময় পরিমাপ করা যায় না। সে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারে কি না, বাস্তব সমস্যায় জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে কি না, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না এসবও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে শুধু তথ্য মনে রাখার চেয়ে তথ্য খুঁজে বের করা, যাচাই করা, বিশ্লেষণ করা এবং নতুন সমস্যার সমাধান করার দক্ষতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি এই পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। একটি স্মার্টফোন বা কম্পিউটার শিক্ষকের বিকল্প নয়; তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শ্রেণিকক্ষের জ্ঞানকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। একটি উদ্ভিদের ত্রিমাত্রিক গঠন দেখা, মহাকাশের কোনো গ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা কিংবা ভার্চুয়াল ল্যাবরেটরিতে কোনো পরীক্ষা দেখা।এসব শিক্ষার্থীর কৌতূহল বাড়াতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুযোগ যেন শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন বৈষম্য তৈরি না করে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। পরিবারের ভূমিকাও কম নয়। শিশুর পরীক্ষার নম্বর নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু শুধু নম্বরের ওপর সাফল্যের সংজ্ঞা দাঁড় করালে শিশুর শেখার আগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সন্তান যদি কোনো অদ্ভুত প্রশ্ন করে, তাকে থামিয়ে না দিয়ে বলা যায়‘চলো, বিষয়টি খুঁজে দেখি।’ কোন প্রশ্নের উত্তর না জানা লজ্জার নয়; বরং একসঙ্গে উত্তর খোঁজার অভ্যাসই শিশুকে আজীবন শিক্ষার্থী করে তুলতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কৌতূহলী শিক্ষার্থীই ভবিষ্যতের গবেষক, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও চিন্তক হতে পারে। যে শিশু আজ প্রশ্ন করতে শেখে, সে আগামী দিনে প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করতে শেখে। যে শিক্ষার্থী ‘কেন’ জানতে চায়, সে একদিন হয়তো নতুন কোনো উত্তর খুঁজে বের করবে। তাই শ্রেণিকক্ষে শুধু নীরবতা চাই না, চাই কৌতূহলের সাম্যতা। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, চাই বাস্তব জীবন বোঝার ক্ষমতা। বইয়ের পাতা থেকে শিক্ষা যেন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়, আর শ্রেণিকক্ষ যেন হয়ে ওঠে প্রশ্ন, অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের জায়গা। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষকে জানতে শেখানো, তবে সেই শিক্ষার প্রথম শর্তই হলো কৌতূহল।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।