শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ক্ষমতা, নৈতিক স্খলন এবং অসহায় নারীর মর্যাদা

Author

মোঃ রুহুল আমিন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৫ বার

রাতটা ছিল অন্যসব রাতের মতোই। কিন্তু কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও বদলে দিল অসংখ্য মানুষের টাইমলাইন। মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলেন একজন প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি এবং তার সাথে এক তরুণী। শুরু হলো প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্ন, ব্যাখ্যা আর প্রতিব্যাখ্যার ঝড়।
কে এই তরুণী? তাদের সম্পর্ক কী? কেন একটি আবাসিক হোটেলের ভিডিও ঘিরে এত বিতর্ক? কিছুক্ষণের মধ্যেই জনপ্রতিনিধির দলকানা ভক্তদের পক্ষে দাবি করা হলো, ভিডিওটি এআই (AI) দ্বারা নির্মিত। আবার পরের দিন জনপ্রতিনিধি দাবি করলেন তরুণী তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রী। কিন্তু বিতর্ক সেখানেই থামেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে শুরু করল চাকরির জন্য জমা দেওয়া জনপ্রতিনিধির সুপারিশকৃত একটি জীবনবৃত্তান্ত, যেখানে তরুণীকে অবিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সামনে এলো কাবিননামা, সুপারিশপত্র, তরুণী এবং জনপ্রতিনিধির বয়সের পার্থক্য ও আরও কিছু নথি। প্রতিটি নতুন তথ্য যেন আগের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আরও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিল। কোনটি সত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর তথ্য আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার—সেটি তদন্তেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু এই ঘটনায় মানুষের মনে যে প্রশ্নগুলো জন্ম নিয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়াও সহজ নয়।
এর কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে অভিযোগ শোনা যায়, একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় এক নেতা কেন্দ্র থেকে আসা এক প্রভাবশালী নেতাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে ১৪–১৫ বছর বয়সী কিশোরী খুঁজছিলেন। অডিওতে একজন নারীকে একটি অসচ্ছল পরিবারের মেয়ের কথা বলতে শোনা যায়। অভিযোগটির সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু এমন অভিযোগই আমাদের সমাজের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
দুটি ঘটনা, দুটি ভিন্ন সময়, দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। কিন্তু দুটি ঘটনার মাঝখানে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—আমাদের সমাজে ক্ষমতা, অর্থ এবং প্রভাবের কাছে একজন দরিদ্র বা অল্পবয়সী নারীর স্বাধীনতা আসলে কতটা নিরাপদ?

আমার কাছে এই লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনো ব্যক্তি, কোনো দল বা কোনো ভাইরাল ভিডিও নয়। বরং প্রশ্নটি হলো—ক্ষমতার সঙ্গে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য যুক্ত হয়, তখন একজন নারীর সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন থাকে? একই সাথে, বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে যে ভয়াবহ নৈতিক স্খলন ও পচন ধরেছে, এটি তারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

আজকে ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা ব্যক্তিদের অনেকেই নিজেদের আইন ও নীতি-নৈতিকতার ঊর্ধ্বে মনে করছেন। পদ-পদবি, সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে তারা পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত স্বার্থ ও কাম-লালসা চরিতার্থ করার হাতিয়ারে। ক্ষমতাসীনদের এই নারীঘটিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ক্ষমতার দাপটে তৈরি হওয়া এক ধরনের বেপরোয়া মানসিকতার ফসল। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকলে যে কোনো অপরাধ বা অনৈতিক আচরণকে ‘এআই প্রযুক্তি’, ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ কিংবা মেকি ‘বৈধতার’ অজুহাতে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব।
আইন হয়তো বলবে, প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারেন। সেটি অবশ্যই সত্য। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান আর বাস্তবতা আমাদের আরেকটি প্রশ্ন করতে শেখায়—সিদ্ধান্তটি কি সত্যিই চাপ, নির্ভরশীলতা, প্রভাব কিংবা প্রলোভন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল? একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, যার পরিবারের অভাব রয়েছে, যার একটি চাকরি তার পুরো পরিবারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে—সে কি সব সময় প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় থাকে? ক্ষমতা যখন একদিকে, আর অভাব অন্যদিকে দাঁড়ায়, তখন “সম্মতি” শব্দটির অর্থও অনেক সময় জটিল হয়ে ওঠে।
এই প্রশ্নটি শুধু একটি বিয়ে বা একটি অডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য দরিদ্র নারী চাকরি, পদোন্নতি, আর্থিক সহায়তা কিংবা নিরাপত্তার আশায় বিভিন্ন ক্ষমতাবান ব্যক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন। আর এই সুযোগটিই নেন ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ক্ষমতার অসমতা ও নেতৃত্বের নৈতিক স্খলন এমন একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে নারী শোষণের সুযোগ অনায়াসে তৈরি হয়। আর সেই সুযোগই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা সমস্যার মূল কারণ নিয়ে খুব কম কথা বলি। বরং আলোচনা আটকে যায়—কে কোন দলের, কার ভিডিও, কার অডিও, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—কেন একজন অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে চাকরিকে জীবনের একমাত্র ভরসা মনে করবে? কেন একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সুপারিশ ছাড়া অনেকের কাছে একটি ছোট চাকরিও অধরা মনে হবে? কেন সমাজে এমন বৈষম্য থাকবে, যেখানে ক্ষমতা ও অনৈতিকতা মানুষের মর্যাদার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে?
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না। দরকার এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে একজন দরিদ্র নারী চাকরি পাওয়ার জন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বারস্থ হতে বাধ্য হবেন না। নিয়োগব্যবস্থা হতে হবে স্বচ্ছ, সামাজিক নিরাপত্তা হতে হবে শক্তিশালী, আর নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের কাছ থেকে উচ্চতর নৈতিক মানদণ্ড প্রত্যাশা করা শুধু বাঞ্ছনীয় নয়, বরং আবশ্যক। কারণ নেতৃত্ব শুধু শাসনের নয়, চরিত্র ও বিশ্বাসের প্রতীক। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে নেতৃত্ব যখন নৈতিকভাবে স্খলিত হয়, তখন গোটা সমাজের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। মানুষের আস্থা একবার ভেঙে গেলে সেটি পুনর্গঠন করা খুব কঠিন।
আমরা প্রায়ই বলি, নারীর ক্ষমতায়ন চাই। কিন্তু ক্ষমতায়ন কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই হবে, যখন কোনো নারী চাকরি, অর্থ বা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নিজের মর্যাদা, স্বাধীনতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে আপস করতে বাধ্য হবেন না এবং ক্ষমতার কাছে নারীর আত্মসম্মান বলি হবে না।
সত্য-মিথ্যার বিচার আদালত করবে, তদন্ত সংস্থা করবে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের নৈতিক স্খলন ও অসহায় নারীদের এই বাস্তব ঘটনাগুলো আমাদের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে রাষ্ট্রকে, সমাজকে এবং আমাদের প্রত্যেককে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় ক্ষমতাবান মানুষের প্রভাব কিংবা বাহুবল দিয়ে নয়; বরং সবচেয়ে অসহায় মানুষের মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত এবং শাসকরা কতটা নৈতিক, তা দিয়েই নির্ধারিত হয়।

লেখক: সভাপতি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পর্ষদ।
এই লেখাটি ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে শেয়ার বিজ, আজকের পত্রিকা, বাংলাবাজার পত্রিকা পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।