বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

শিশু-কিশোরকে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের ভূমিকা

Author

জান্নাত আক্তার শিলা , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৩ বার


অসৎ সঙ্গে বিষাক্ত দংশন: শিশু-কিশোররা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে
একজন শিশুর বিকশিত হওয়া কৈশোরকাল থেকে শুরু হয়। কিশোর ও তরুণ বয়স জীবন গঠনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়। শিশু-কিশোরদের এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সাথে তাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটে। এসময়ে তীব্র আবেগ কাজ করে, সবকিছু জানা ও শেখার আগ্রহ বাড়ে,ঠিক-ভুল বাছাই করার মানসিকতা থাকেনা, নিজের মতো করে ভাবতে শুরু করে ও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার যোগ্য মনে করে। একজন শিশুর পুর্নাঙ্গ বিকাশে এই সময়টা বড্ড নাজুক তাই তারা সহজেই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়।বাবা-মায়ের অতিরিক্ত শাসন বা ব্যস্ততা,পারিবারিকভাবে তেমন সঙ্গ না পাওয়া ইত্যাদি কারণে বন্ধুরাই সবচেয়ে আপন হয়ে উঠে।একজন কিশোর যখন কোনো খারাপ বন্ধুদের সাথে জড়িয়ে পড়ে তখন সে ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যায়। কৌতূহলবশত কিংবা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে প্রথমে ধূমপান থেকে শুরু করে ক্রমশ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবনে আসক্ত হয়ে পড়ে । মাদকাসক্তির এই পথ ধরে জন্ম নেয় কিশোর গ্যাং, চুরি, ছিনতাই-চাঁদাবাজি এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।খারাপ সঙ্গ কেবল কিশোর-তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় না বরং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে। পড়ালেখায় অমনোযোগিতা এবং পরিবারের সাথে দূরত্ব তৈরির ফলে তাদের জীবন এক চরম হতাশায় পর্যবসিত হয়।তাছাড়া বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ফোনের ব্যবহার, দলবেঁধে ঘণ্টার পর ঘন্টা অনলাইন গেইমে আসক্ত হয়ে রাতজাগা,গেমের ভিতর অশ্লীল গালিগালাজ ও উদ্ধত পূর্ণ আচরণ, টিকটিক করে ভাইরাল হওয়ার নেশা কিশোদের স্বাভাবিক বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করছে।এসব সামাজিক সাইট ও অনলাইন গেমের আইটেম কিনতে গিয়ে বাবা-মায়ের অগোচরে টাকা খরচ করছে। টিকটক বা রিলসে লাইক, ভিউ ও কমেন্টই হয়ে ওঠে আত্মমূল্যের মাপকাঠি। জনপ্রিয়তার লোভে অনেকে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ নেয়, অনুপযুক্ত কনটেন্ট বানায় যার ঝুঁকি প্রাণহানি পর্যন্ত গড়াতে পারে। ট্রল ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে বাড়ে হীনম্মন্যতা ও মানসিক চাপ। প্রতিনিয়ত রাত জাগার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং চোখের সমস্যা ও মাথাব্যথা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে খিটখিটে মেজাজ, একাকিত্ব ও উদ্বেগ বাড়ে। অথচ ব্যস্ততার কারণে অনেক বাবা-মা জানেনই না তাঁদের সন্তান কার সঙ্গে মিশছে বা মোবাইলে কী দেখছে কিংবা কতটা হতাশায় ভুগছে। বাবা-মা টের পেতে পেতে সন্তানরা অনেকটাই জড়িয়ে পড়ে। তখন তাদের ফিরিয়ে আনা অনেকটাই কষ্টসাধ্য।এর প্রভাব শুধু কিশোরের ওপর পড়ে না,পরিবার এবং সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে।এসবে আসক্ত কিশোর পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে ওঠে ফলে অনেকের  শিক্ষাজীবন মাঝপথেই থেমে যায়। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায়।তাদের এসব কাজে বাবা-মা লজ্জিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, পরিবারে নেমে আসে অশান্তি ও অর্থকষ্ট। দেশ একজন সম্ভাবনাময় জনসম্পদ হারায়।শিশু-কিশোরদের সুন্দরভাবে বিকশিত হওয়ার পথে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরী। নিম্নোক্ত উপায়গুলোর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের সুন্দর বুদ্ধিবৃত্তভবে বিকাশের পথ সুগঠিত হবে।প্রথমত,সন্তানদের সময় দেয়া।একজন মানুষ পরিবারের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় থাকে। তাই শিশু-কিশোরদের সাথে গল্প করা, একসাথে খাবার খাওয়া,তাদের ইচ্ছা-আগ্রহ সম্পর্কে জানা,কবিতা-গান বা বই পড়ে শোনানো,বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া বা নিয়মিত বিকেলে মাঠে খেলতে দেয়া ইত্যাদি কাজগুলো করলে শিশুর উৎফুল্লতার সাথে বুদ্ধি বিকাশ দ্রুত হবে।দ্বিতীয়ত,শিশু-কিশোরদের বন্ধু নির্বাচনে বাবা-মায়ের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরী।সন্তানের বিকশিত হওয়ার সুন্দর সময়ে তাদের সঠিক বন্ধু নির্বাচনে সহায়তা করা, সন্তানদের বন্ধুদের চিনা, তাদের পরিবারের সঙ্গে পরিচিত থাকা, সন্তান কোথায় যায় কাদের সঙ্গে চলে এবং কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করে এসব বিষয়ে সবসময় নজর রাখা প্রত্যেক অভিভাবকদের দায়িত্ব। সময়মতো খোঁজ নিলে ভুল পথ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনা সহজ হয়।আর সঠিক বন্ধুদের সঙ্গ পেলে শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতামুলকভাবে সুন্দর আগামীর পথে এগিয়ে যায়। তৃতীয়ত,শিশু-কিশোররা অনুকরণপ্রিয়।পরিবার থেকেই তাদের বিকাশ ঘটে থাকে তাই তাদের সামনে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার,পারিবারিক ঝগড়া-বিবাদ, পরিবারের সদস্যদের অসম্মান বা অনুপযুক্ত শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।পরিবারের সদস্যদের সুসম্পর্ক ও সৌহার্দপূর্ণতা শিশু-কিশোরদের মানবিক মুল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।চতুর্থত,নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলা।ছোটবেলা থেকেই নৈতিক-অনৈতিক কাজ সম্পর্কে ধারণা দেয়া,ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শিষ্টাচার সম্পর্কে উৎসাহিত করলে তাঁরা নিজেই সঠিক পথে এগিয়ে যাবে। পঞ্চমত,বর্তমান সময় প্রযুক্তির যুগ।অনলাইন ক্লাস, শিক্ষাগত প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করা। তাছাড়া তাদের চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতার বিকাশে কিছু নির্দিষ্ট অ্যাপস, ইউটিউব কিডস,ধাঁধা বা গনিতের গেমস কিংবা কোডিং শেখায় এমন অ্যাপস এর পরিমিত ব্যবহারের সুযোগ দেয়া। ফলে আমাদের দেশের শিশু-কিশোররাও  প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে। ষষ্ঠত,শিশু-কিশোরকে সৃজনশীল কাজে উদ্ধুদ্ধ করা।ছবি আঁকা,গান শেখা, নিজের কাজ নিজে করা,কবিতা আবৃত্তি করা, গল্পের বই পড়া,নতুন কিছু তৈরিতে বা গাছ লাগানো ও গাছের পরিচর্যা করতে উৎসাহিত করা এবং ঘরে কাজে সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করা। এসব কাজ শিশু-কিশোরদের নিজেদের সমৃদ্ধভাবে গড়ে তুলবে।শিশু-কিশোররা আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং মানবিক ও মুল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনে  আগামীর কারিগর। তাদের প্রতি যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ দেয়া,পরিবারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়া, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা,সঠিক বন্ধু নির্বাচন, ডিভাইস ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় ও নির্ধারিত অ্যাপস ব্যবহারের নিশ্চিতকরণ  এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই শিশু-কিশোরদের সুন্দর ও উপভোগ্য ভবিষ্যত গড়ে তুলবে। পরিবার, শিক্ষক ও সমাজ একসাথে সচেতন থাকলেই আগামীর জনসম্পদ শিশু-কিশোররা সুস্থ, নৈতিক ও আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে।
জান্নাত আক্তার শিলা
রসায়ন বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
লেখক: সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।