শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: নীরব মহামারি

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৯ বার

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: নীরব মহামারি

একসময় যে সংক্রমণ সামান্য কিছু ওষুধেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসত, আজ তার অনেকগুলোই চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, জীবাণুর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েও যখন ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সারে না, তখন বিষয়টি শুধু একজন রোগীর চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, হাসপাতাল, সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত পুরো জনস্বাস্থ্যে। এই অদৃশ্য সংকটের নাম অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। এর মধ্যে ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধিতা সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া প্রতি ছয়টি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রায় একটি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ছিল। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা ব্যাকটেরিয়া-অ্যান্টিবায়োটিক সমন্বয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে প্রতিরোধক্ষমতা বেড়েছে; অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধির গড় হার ছিল বছরে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আসলে কী? সহজভাবে বললে, কোনো ব্যাকটেরিয়া যখন নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবে আর ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রিত হয় না, তখন তাকে ওই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী বলা হয়। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিরোধী হয়ে যায় না; বরং ব্যাকটেরিয়ার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়ে ওষুধকে অকার্যকর করে তোলে। অ্যান্টিবায়োটিক মূলত ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। সর্দি-কাশি বা অধিকাংশ ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো উপকার নেই। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজন না থাকলেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কেনা, সামান্য জ্বর-সর্দি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ, অন্যের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ, ভুল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কিংবা চিকিৎসকের নির্ধারিত মাত্রা ও সময়সূচি না মেনে ওষুধ গ্রহণ। এসব আচরণ সমস্যাকে আরও জটিল করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহারই ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর উদ্ভব ও বিস্তারের প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে। সমস্যাটি শুধু মানুষের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ, প্রাণী, কৃষি এবং পরিবেশ সবকিছু একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। পশুপাখির চিকিৎসায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের যথেচ্ছ ব্যবহার, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থায় এর ব্যবহার, হাসপাতাল ও শিল্পবর্জ্য এবং পরিবেশে ওষুধের অবশিষ্টাংশও প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ২০২৬ সালে WHO, FAO, UNEP ও WOAH-এর সমন্বিত উদ্যোগে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় ২০২৬–২০৩৬ সময়কালের নতুন বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো : এটি আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার অনেক অর্জনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। কোনো রোগীর সংক্রমণ যদি প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকে নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে চিকিৎসার বিকল্প কমে যায়। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হতে পারে, চিকিৎসার ব্যয় বাড়তে পারে এবং জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপনসহ এমন অনেক চিকিৎসা আছে যেখানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারাতে থাকলে শুধু সংক্রমণ নয়, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। WHO-এর হিসাবে, ব্যাকটেরিয়াল অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ২০২১ সালে বিশ্বে ৪৭ লাখের বেশি মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় National Strategy and Action Plan for Antimicrobial Resistance Containment in Bangladesh (2023–2028) গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যেও এই জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনাকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শুধু জাতীয় পরিকল্পনা করলেই হবে না; এর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি। প্রথমত, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত নয়। একইভাবে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের মাত্রা বা সময়সূচি নিজের ইচ্ছায় পরিবর্তন করাও ঠিক নয়। রোগের ধরন নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে অনুমানের ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা কমে। হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে চিকিৎসকদের পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। জনসচেতনতাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভুল ধারণা হলো- শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই দ্রুত ভালো হওয়া যায়। বাস্তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা ভুল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ভবিষ্যতের চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তাই রোগীকে শুধু ওষুধ দেওয়া নয়, কেন ওষুধটি দেওয়া হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং কখন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এসব বিষয়ও বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন। অন্যদিকে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক, টিকা ও রোগ নির্ণয়ের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাও বাড়াতে হবে। কারণ জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা বাড়লেও নতুন ওষুধ তৈরির গতি সেই তুলনায় যথেষ্ট নয়। WHO-ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গবেষণা ও উন্নয়নে সংকট এবং নতুন কার্যকর ওষুধের সীমিত পাইপলাইনের কথা জানিয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এমন এক সংকট, যা শব্দ না করেই আমাদের ভবিষ্যৎ চিকিৎসাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আজ একটি অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ হয়তো ব্যক্তিগতভাবে বড় কোনো সমস্যা মনে নাও হতে পারে, কিন্তু একই আচরণ যখন কোটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার ফল ভয়াবহ হতে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিককে সাধারণ ওষুধ হিসেবে নয়, জীবন রক্ষাকারী সীমিত সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা শুধু আজকের রোগীর জন্য নয়- আগামী প্রজন্মের জন্যও সংরক্ষণ করতে হবে। এখনই যদি চিকিৎসক, রোগী, ফার্মেসি, হাসপাতাল, কৃষি, প্রাণিসম্পদ বিভাগ এবং নীতিনির্ধারকরা সমন্বিতভাবে দায়িত্বশীল না হন, তবে এমন একটি সময় আসতে পারে যখন সাধারণ সংক্রমণও আবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।