শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

রেমিট্যান্স ও প্রবাসী শ্রমিক: অর্থনীতির নীরব যোদ্ধা

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৯ বার

রেমিট্যান্স ও প্রবাসী শ্রমিক: অর্থনীতির নীরব যোদ্ধা

বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে যেসব খাত অবিরত কাজ করে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে প্রবাসী শ্রমিক ও তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স এর অবদান উল্লেখযোগ্য। দেশের উন্নয়নের গল্পে তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি কিংবা রপ্তানি খাতের কথা যতটা আমরা বলি, প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান ততটা আলোচিত হয় না। অথচ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, দারিদ্র্য হ্রাস, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তাঁদের ভূমিকা অসামান্য। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তাঁরা যে অর্থ দেশে পাঠান, সেটিই রেমিট্যান্স নামে পরিচিত। এই রেমিট্যান্স কেবল একটি পরিবারের জীবনযাত্রার মানই উন্নত করে না; বরং পুরো দেশের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করে। তাই প্রবাসী শ্রমিকেরা বাংলাদেশের অর্থনীতির নীরব যোদ্ধা। বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসনের ইতিহাস স্বাধীনতার পর থেকেই ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অবকাঠামো নির্মাণের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার খুলে। বর্তমানে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। তাঁদের মধ্যে নির্মাণশ্রমিক, কারখানার কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চালক, কৃষিশ্রমিকের পাশাপাশি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইটি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাও রয়েছেন। এই বহুমুখী কর্মসংস্থানই বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম ভিত্তি গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক রেমিট্যান্স পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাতের মধ্যেও প্রবাসীরা নিয়মিত অর্থ পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্সই বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে স্থিতিশীল উৎসগুলোর একটি। আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা এবং টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রেমিট্যান্সের প্রভাব কেবল জাতীয় অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের তৃণমূল পর্যায়েও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। বিশ্বব্যাংকের মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফে উল্লেখ করা হয়েছে, রেমিট্যান্স নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে দারিদ্র্য কমাতে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়াতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। বিদেশে কর্মরত একজন প্রবাসীর পাঠানো অর্থ দিয়ে অসংখ্য পরিবার সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করছে, চিকিৎসা ব্যয় বহন করছে, কৃষিতে বিনিয়োগ করছে কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করছে। ফলে একটি পরিবারের আয় বৃদ্ধি স্থানীয় বাজার ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে কঠিন সংগ্রামের গল্প। মধ্যপ্রাচ্যের প্রখর রোদে নির্মাণকাজ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত বিশ্রাম, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, পরিবার থেকে বছরের পর বছর দূরে থাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়েই অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক জীবন কাটান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসী শ্রমিকেরা বিশ্বজুড়ে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশে কাজ করেন এবং তাঁদের শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা প্রযোজ্য। অনেকেই নির্ধারিত বেতন পান না, আবার অনেককে নিয়োগচুক্তির বাইরে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করা হয়।সমস্যা যে শুধু প্রবাস জীবনে শুরু হয় , তেমনটা নয়। অনেকের দুর্ভোগ শুরু হয় প্রবাসে পাড়ি দেওয়ার আগেই। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালচক্রের প্রতারণা এবং অনিয়মিত নিয়োগপ্রক্রিয়ার কারণে বহু শ্রমিক উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যান। ফলে প্রথম কয়েক বছর তাঁদের উপার্জনের বড় অংশ ঋণ পরিশোধেই শেষ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ওয়াল্ড মাইগ্রেশন রিপোর্ট – নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত হলে শ্রমিকের অধিকার যেমন সুরক্ষিত হয়, তেমনি প্রেরণকারী দেশের অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয়। বর্তমান বিশ্বে শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিক্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু বিএমইটির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদেশগামী বাংলাদেশি কর্মীদের একটি বড় অংশ এখনও স্বল্পদক্ষ। ফলে তাঁরা তুলনামূলক কম মজুরির কাজে নিয়োজিত হন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। অথচ ভাষা, কারিগরি দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে একই সংখ্যক কর্মী থেকেও অনেক বেশি রেমিট্যান্স অর্জন সম্ভব। নারী প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারীরা গৃহপরিচর্যা, স্বাস্থ্যসেবা, পোশাকশিল্প ও অন্যান্য সেবামূলক খাতে কাজ করছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স হাজারো পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করছে। তবে অনেক নারী শ্রমিক নির্যাতন, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বারবার জোর দিয়েছে যে, অভিবাসী নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা এবং ন্যায্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশকেও এই বিষয়ে আরও কার্যকর কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দ্রুত নিতে হবে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ। এখনও কিছু প্রবাসী দ্রুত লেনদেন বা সামান্য বেশি বিনিময় হারের আশায় হুন্ডির মতো অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। কিন্তু এতে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা প্রবেশ করে না, ফলে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রণোদনা দিচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ, দ্রুত ও কম খরচে পৌঁছে দিতে পারলে হুন্ডির ব্যবহার আরও কমানো সম্ভব হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানকে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁরা দেশে ফিরে আসার পর তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সঞ্চয়কে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও জরুরি। অনেক দেশে দেখা যায়, প্রবাসফেরত কর্মীরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি কিংবা সেবাখাতে বিনিয়োগ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশেও যদি প্রবাসীদের জন্য সহজ ঋণ, কর-সুবিধা, বিনিয়োগ সহায়তা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা যায়, তাহলে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, রেমিট্যান্স কেবল বৈদেশিক আয়ের উৎস নয়; এটি অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলার একটি কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থাও। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা মহামারির সময় রেমিট্যান্স অনেক দেশের পরিবারকে দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা করেছে। বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের সহায়তা দিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, প্রবাসীরা শুধু পরিবারের নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও নির্ভরযোগ্য অংশীদার। বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। প্রথমত, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে দালালনির্ভর ব্যবস্থারোধ করতে হবে। তৃতীয়ত, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক খাতগুলোতে। চতুর্থত, বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে শ্রমিকদের আইনি সহায়তা ও জরুরি সেবা আরও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসন ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ নীতিমালা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, রেমিট্যান্সের প্রতিটি পয়সার পেছনে লুকিয়ে থাকে একজন মানুষের ঘাম, ত্যাগ এবং পরিবার থেকে দুরে থাকার দুঃখ। পারিবারিক আনন্দ থেকে দূরে থাকা, সন্তানকে বড় হতে না দেখা, অসুস্থ বাবা-মায়ের পাশে থাকতে না পারা কিংবা প্রতিকূল পরিবেশে বছরের পর বছর কাজ করা। এসব কষ্টের বিনিময়েই তাঁরা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন। তাই তাঁদের অবদানকে কেবল অর্থনৈতিক সূচকে সীমাবদ্ধ রাখা অন্যায় হবে। প্রবাসী শ্রমিকরা বাংলাদেশের উন্নয়নের নীরব স্থপতি। তাঁরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন, দারিদ্র্য কমান, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখেন এবং অর্থনৈতিক সংকটের সময় দেশের পাশে দাঁড়ান। তাই তাঁদের জন্য নিরাপদ অভিবাসন, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশে ফিরে সম্মানজনক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ একজন প্রবাসী শ্রমিক শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য লড়াই করেন। তাঁদের ঝরা ঘামেই সমৃদ্ধ হয় দেশের অর্থনীতি।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।