শীতের আমেজে রস অভিযান
হেমন্তের প্রায় শেষ শীত আসন্ন। সোনালী মাঠে কৃষকের ধান কাটার উৎসব প্রায় শেষের দিকে। গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা মেতে উঠেছে নবান্ন উৎসবে। ঘরের বাহিরে হাড় কাঁপানো শীত। এই শীতে লেপ কাঁথা ছেড়ে বিছানা থেকে ওঠা মনে হয় যেনো যুদ্ধ জয়ের চেয়েও বড় কিছু। কিন্তু এই শীতের ভয়কে জয় করে তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একদল তরুণ লেখকেরা সেদিন বেরিয়ে পড়েছিলাম। আমাদের উদ্দ্যেশ্য ছিলো ত্রিবেণীতে রসের অভিযান।
সেদিন ফজরের আযান কানে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেলো। বাহিরে তখনো ভোরের আলো ফোটে নাই। চারদিকে কুয়াশা আর ঘোর অন্ধকার। তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে। অযু করে এসে ফজরের নামাজ আদায় করছিলাম। ঠিক সে সময় ফোন বেজে উঠলো। নামাজ শেষ করে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ফোরামের সভাপতি তালহা ভাইয়ের কন্ঠ ভেসে এলো। ভাই ফোন দিয়েই দ্রুত বের হয়ে জিয়া মোড়ে যেতে বললো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভাই ফোন কেটে দিলো। তালহা ভাইয়ের আগে সানি কয়েকবার ফোন দিয়েছে। নামাজে ব্যস্ত থাকায় রিসিভ করতে পারিনি। কোনো বিপদ হয়েছে ভেবে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। জিয়ামোড়ে যেতেই দেখি তালহা ভাই দাঁড়িয়ে আছে। ভাই ইশারায় সামনের দিকে অগ্রসর হতে বললো। কারো মুখে কথা নাই। নাক-মুখ দিয়ে শুধু সাদা ফেনার মতো ধোঁয়া বের হচ্ছে। একটু হাটার পর রাসেল হলের সামনে গিয়ে দেখি শিশির এবং বাশার দাঁড়িয়ে আছে। ওদেরকে দেখে আন্দাজ করতে পেরেছিলাম কিছু একটা হতে চলছে । এরপর সবাই মিলে সামিয়া আর নওশীনকে এগিয়ে নিতে পশ্চিমপাড়ার দিকে রওনা দিলাম। ওদেরকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু হল পকেট গেটে গিয়ে দেখি সানি, তারেক, মোসাদ্দেক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এখন আর কারো কিছু বুঝতে বাকি নেই। আমরা তরুণ লেখকেরা হরহামেশাই বেরিয়ে পরি কোথাও ঘুরতে। সবাই একটি ভ্যানে উঠলাম ত্রিবেণী নামক গ্রামের উদ্দ্যেশে। কারন আমরা ত্রিবেণীতে যাচ্ছি রসের অভিযানে। শীতের সকালে চারদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে। শীতে আর ঠান্ডা বাতাসে হাড় যেনো জমে যাচ্ছিলো। শিশির স্নাত পিচ ঢালা রাস্তায় তিন চাকার ভ্যান চলতে লাগলো। রাস্তার চারপাশে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। শীতের সকালের প্রধান আকর্ষণ হলুদ সরিষা ফুলের মাঠ, পিয়াজ রসুনের সবুজ ক্ষেত, মাচায় ঝুলতে থাকা সিম আর লাউয়ের বাহারি ফুল। এসব মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে পৌঁছে গেলাম ত্রিবেণী নামক গ্রামে।
সেখানে রস খেতে গাছির বাসায় গিয়ে হাজির হলাম আমরা। গাছির বাসায় গিয়ে দেখি তিনি এখনো গাছ থেকে রস নামিয়ে নিয়ে আসেননি। আমরা যেতেই গাছি গেলো হাড়ি ভর্তি রস নামিয়ে আনতে। এই ফাঁকে তারেক আমাদের চন্দ্রমল্লিকা ফুল দেখতে নিয়ে গেলো পাশের বাসায়। সেখান থেকে বের হয়ে কিছুদূের যেতেই দেখা মিললো কয়েকজন আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারন করার চেষ্টা করছে। আমরাও যুক্ত হলাম তাদের সাথে একটু উষ্ণ হতে। সেখানে কয়েকজন ছোটবাচ্চা ছিলো। ওদের দেখে ছোটবেলার সেই দুরন্তপনা স্মৃতির কথা মনে পড়ে গেলো। তারেক একজনকে কোলে নিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করলো। নাম বলার পর হালকা লজ্জা পেয়ে তারা বাসার দিকে দৌড় দিলো। একটু পরে আরো তিন চারটি দল হাজির হলো রসের স্বাদ নিতে। ইতিমধ্যে গাছির সহযোগী হাড়ি ভর্তি রস নিয়ে হাজির। গাছি আমাদেরকে রস ছেঁকে গ্লাসে ঢেলে দিলেন। এক গ্লাস রস খেয়ে তৃপ্তি ঢেকরে শীতের সকালের কষ্টের কথা ভুলে গেলাম। আহা! স্বাদ আর গন্ধে যেনো অমৃত। গ্লাস ভর্তি রস হাতে নিয়ে সবাই ফ্রেমবন্দীও হলাম।
এবার ফেরার পালা। সবাই বলাবলি করতে লাগলো যে মাঠের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আনন্দ নগর হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরবে। যা ভাবা সেই কাজ। নওশীন আনন্দনগরে আসার পর একটু ছ্যাঁকা খেয়ে গেলো। আনন্দ নগরের নাম শুনে সে ভেবেছিলো এটা কোন পার্ক অথবা দর্শনীয় স্থান হবে। কিন্তু এটি আসলে একটি গ্রামের নাম। এদিকে কুজ্ঝটিকা ভেদ করে ফুটে উঠলো সূর্যের আলোক রশ্মি। সবুজ ঘাসের উপর জমা সূর্যালোকিত শিশির বিন্দু চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে। সকালের সূর্যালোকে প্রতিটি উদ্ভিদ যেন নবরূপে সাজিয়ে উঠেছে। হাড়ভাঙা শীত আর ঘন কুয়াশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভোর থেকে মাঠে নেমেছেন গ্রামবাংলার প্রকৃত শিল্পী কৃষকরা। ক্যাম্পাসে ফিরে আমরাও চললাম যে যার মতো কাজে। সেই সাথে স্মৃতির খাতায় জমা রাখলাম আরো একটা সুন্দর দিন।
